Responsive image

প্রকাশিতঃ বৃহস্পতিবার, ০১ জুলাই ২০২১, ০৭:৫৭ অপরাহ্ন

প্রিন্ট করুন

আমার মেয়েবেলা ও কবিতা


Responsive image

বাসন্তি সাহা।। মেয়েবেলায়ই আমাকে কবিতায় পেয়েছিল। কেবল কবিতা য় আমি খুঁজে পেতে চাইতাম সবকিছু । কবিতা আমাকে ফেরায়নি। আশ্রয় দিয়েছে। কবিতায় ডুবে আছি এখনও ।অনেক কাজ বাকি আমার। শেষ করবো বলে বারে বারে ফিরে যাই। দিন গড়িয়ে যায়। অন্ধকার নেমে আসে। ব্যালকনিতে দাড়িয়ে কবিতার জন্য আমি চাঁদের দিকে তাকাই। কেউ কী আমার জন্য প্রতীক্ষা করে আছে? ভোরের শিউলির মতো ঝরে পড়তে থাকি।

আমি ভিড়ের মধ্যে ঘুরে বেড়াই,

গোপন রাখি সকল শোক, কবিতা।

আমি নিজের চোখ উপড়ে আনি,

তোমাকে দিই, তোমার চোখ ফোটাতে কবিতা। (নীরেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী)

 

পৃথিবীর দুষিততম বাতাসে শ্বাস নিয়েও আমরা এতোদিন বেঁচেছিলাম। প্রতি মূহুর্তে ক্ষতিকর বাতাস ফুসফুসে টেনেও আমরা হেসে-খেলে বেঁচেছিলাম। প্রচন্ড রোদে ঘন্টার পর ঘন্টা জ্যামে বসে থেকেও আমরা বেঁচেছিলাম। আমরা নির্বিকার ছিলাম। প্রতিদিন সন্ধ্যায় আমাদের শপিংমল, খাবারের দোকানগুলো আলোতে ঝলমল করতো। আমরা বেঁচেছিলাম। দেশের টাকায় সুইস ব্যাংকের ভল্টে পাহাড় জমেছে। তাও সব মানুষ দুবেলা খেতে পারতো। সন্ধ্যায় স্টুডিওতে ছেলে-মেয়েকে নিয়ে ফুলের তোড়া হাতে ছবি তুলতো। অবিরাম বিষ-শ্বাস নিয়েও আমরা হাসতাম । আড্ডা দিতাম।

 

আজ কোথাও কিছু নেই। কেবল বিষাদ আর রিক্ততা। কখনও ক্লান্ত দুপুরে অথবা নির্জন সন্ধ্যায় ছোটবেলার হিজল ফুলের গন্ধটা যেনো ফিরে আসে। হিজলের সাথে সাথে চলে আসে কৃষ্ণচুড়া, পলাশ আর পারিজাত। তারা আমাকে কখনো জড়িয়ে ধরে, কখনো কাঁদায়, মনে করিয়ে দেয় আমরা কিন্তু এতদিন তোমার সাথেই ছিলাম। ছেড়ে যাইনি । তুমিই আমাদের ভুলে ছিলে। আমার অভিমানী স্মৃতিগুলো আমাকে গুড়ো গুড়ো করে দেয় আবার কতগুলো আমাকে জড়িয়ে ধরে। কোথাও আকাশে মেঘ নেই জেনেও আগুনের মতো তপ্ত দুপুরে আমি বৃষ্টি খুঁজতে থাকি অথবা নিজেই বৃষ্টি হয়ে ঝরতে থাকি।

 

আমি এখানে আছি। আবার নেইও। সংসারের অগণিত কাজ করছি। কানে বাজছে ‘খালাম্মা সাহায্য করেন’ । এই আর্তি প্রতিটা দুপুরে একই সুরে বেজে চলে। হাতের কাজ থেমে যায়। আমাকে আরও ক্লান্ত করে। আমি চলে যাই আমার খুব ছোটবেলায় চার বছর বয়সে। ফরিদপুরের কোটালিপাড়ায়। আমার ঠাকুরমার সাথে ভাত খেতে বসেছিলাম। পাশের ঘরে ওরা কতগুলো মিষ্টি আলু সেদ্ধ মেখে চারজন চারভাগ করে খেয়ে নিল। কেন খাচ্ছে এসব? ওরা ভাত খাবে না? ঠাকুরমা বলেছিল, ওদের বাবাকে যুদ্ধে পাকিস্তানি আর্মিরা মেরে ফেলেছে। ওরা তিনবোন আর মা অন্যের ধান সিদ্ধ করে। তাতে কেবল রাতেই ভাত খেতে পারে। তাই দুপুরে মিষ্টি আলু খায়। আমি কখনো, একদিনের জন্যও পাশের ঘরে বসে ভাত-মাছ খাওয়ার অপরাধ ভুলিনি। আমাকে প্রতিদিন আরও অপরাধি করে দেয় এই আর্তি।

 

আমার স্কুলে পড়ার সময় আমাদের তেজপাতা গাছটায় রোজ দুপুরে একটা হলুদ বউ কথা কও পাখি ডাকতো। স্কুল থেকে ফিরে আমি প্রতিদিন পাখিটার জন্য অপেক্ষা করতাম । কখনো দুটোও আসতো ঠিক দুপুর বেলা । সবাই যখন ঘুমতো আমি সিঁড়ির এককোনে বসে পাখিটার জন্য অপেক্ষা করতাম। তারপর একদিন পাখিটা আর এলোনা । আমিও কয়েকদিন অপেক্ষা করার পর—তাকে ভুলে গেলাম। কিন্তু তার হলুদ রঙটা ভুলিনি। কোনো হলুদ রঙ দেখলেই পাখিটাকে মনে পড়ে। আজ দুপুরে পাখিটা ফিরে এলো আমার কাছে—হঠাৎ মা তোমার এই শ্যাম্পুটা একটুও স্যুট করছে না । খুব বেশি হেয়ার ফল হচ্ছে, চেঞ্জ করতে হবে। আমার অভিমানি মুহুর্তরা ধাক্কা খায়। আমি চেয়ে থাকি অপলক। আমার নয় বছরের মেয়ে তিস্তা সঠিক শ্যাম্পুর কথা বলে দেয়।

 

আমার বন্ধুরা অনেকদিন ধরে শান্তি নিকেতন যাওয়ার প্লান করছে। ওখানকার খোয়াই এর হাটের ডোকরার গয়না ও খেস এর শাড়ি খুব বিখ্যাত। আমি চুপ করে শুনি। আসলে আমার কোথাও যাবার নেই , কোথাও পৌঁছবারও তাড়া নেই। আমার মনের মধ্যে সব সময় বেজে চলে মেঘ কুয়াশা ঘেরা রাস্তা, তার নিচ দিয়ে বয়ে চলা তিস্তার জলের কলকল শব্দ। চমৎকার নীল আকাশ, মেঘে ঢাকা পাহাড়, দূর থেকে ধোয়ার মতো মনে হয়, আমি কেবল চুপ করে থাকি। আমার ছুটি ফুরিয়ে গেছে কখন অন্যমনে॥

 

আমি এখন আর রাত জেগে তোমার জন্য অপেক্ষা করি না। আমার ক্লান্ত অভিমানী চোখদুটোতে এখন কেবল ঘুম নেমে আসে। যেনো বহুকাল আমি জেগেছিলাম। হয়তো গত জনমের না ঘুমানো আর ক্লান্তি নিয়ে আমার জন্ম হয়েছিল। সেই ঋণ যেনো আমি বয়ে বেড়াচ্ছি আজও। ‘**তুমি** কোন্‌ **ভাঙনের পথে এলে** সুপ্তরাতে। আমার ভাঙল যা তা ধন্য হল চরণপাতে॥ আমি রাখব গেঁথে তারে রক্তমণির হারে,. বক্ষে দুলিবে গোপনে নিভৃত বেদনাতে॥

লেখকঃ কর্মসূচী পরিচালক, দর্পণ।


সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মোঃ মাহবুব মোর্শেদ

বাড়ী নং ১০০, বায়তুল আমান, (৫ম তলা), বড় মসজিদের বিপরীত পাশে, বাগিচাগাঁও, কুমিল্লা।
০১৭১৫-৭০৭১২৪,০১৮১৮-১০৩২২৫
newscomilladarpan@gmail.com
© কুমিল্লা দর্পণ। সর্বসত্ব সংরক্ষিত