বৃহস্পতিবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০২১, ০২:২১ অপরাহ্ন

সংবাদ শিরোনাম :
ক্লাস শুরু হলেই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা কুমিল্লায় স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনে প্রস্তুতিমূলক সভা নোয়াখালীতে সাংবাদিক বুরহান উদ্দিন হত্যার প্রতিবাদে কুমিল্লায় মানবন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সব পরীক্ষা স্থগিত 💜 অনুভবে, ভালবাসায়……💜 দেবিদ্বার উপজেলা চেয়ারম্যান পদের উপ-নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর ইশতেহার ঘোষণা বরুড়ায় কিশোরের গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা ভিসিটির গৌরবের এক যুগ ২০ লাখের বেশি মানুষ ভ্যাক্সিন নিলেন ” ভাষার হোক জয় “ কুমিল্লায় জেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভা কুমিল্লায় পারিবারিক কলহে দুই দিনে পাঁচ খুন নবযাত্রা’র দ্বিতীয় সোপান বসন্ত এসে গেছে “শেষ দেখা”
“স্মৃতির নিকুঞ্জ পথে ঝরা অনুভূতি মোর…”

“স্মৃতির নিকুঞ্জ পথে ঝরা অনুভূতি মোর…”

– কণা সাহা।। মাঘের সন্ধ্যা! করোনাকালীন নগরজীবনে ব্যস্ততার পূণরাবৃত্তি ফিরে এলেও হাড়- কাঁপানো, বাঘ-পালানো মাঘের হিমেল ছোঁয়া অট্টালিকাবাসীর যাপিত জীবনে বিগত বছরগুলো অপেক্ষা এবার কম অনুভূত হয়েছে। তবে মফস্বলে শীতের প্রভাব বহমান। প্রখর তাপের ধূলি ধূসরিত, বায়ুদূষণে আবদ্ধ, অবসরবিহীন ছকে বাঁধা জীবনে হিম বাতাস বওয়া শীত আমার জন্য কিছুটা স্বস্তি এনে দেয়। কারন, লেপ মুড়িয়ে আলসে, জবুথবু, আয়েশী প্রহর কাটানো হয়না প্রায় দুই যুগ। তাই ফেলে আসা সময়গুলো বড্ড মূল্যবান অবয়বে মস্তিষ্কে ঘুরপাক খায়।

 

পূর্ণিমার রূপালী জ্যোৎস্না যেমনি করে মোহময়তায় আপ্লুত করে মুছে দেয়- সকল
নশ্বর নেতিবাচকতা! তেমনি করেই আমি প্রতিনিয়ত শুদ্ধ হই ,জীবন্ত হই-সীমাবদ্ধতায় প্রাপ্ত আমার স্বল্পব্যাপ্তির সোনালী শৈশবের স্মৃতিতে অবগাহন করে। তাই ভাবনার সমূদ্র তটে মহাকালের ধূলো ঝেড়ে স্মৃতিপটের রং খুঁজে নিয়ে জীবনের ধূসর ক্যানভাসে আনন্দ-বেদনার জলরঙে বিমূর্ত ছবি আঁকি……। অবশেষে শৈত্য প্রবাহের প্রভাবে মাঘ ঋতু তার অভিমানী অবগুন্ঠণ উন্মোচন করে হিমেল কুয়াশা মাখা শীতের স্পর্শে রাজধানীবাসীকে সিক্ত করল!

 

এ আমার মাঘের সন্ধ্যের হৃদয়ের অন্তঃপুরের স্মৃতি-জাগানিয়া আত্নচয়ণ। যে স্মৃতিচারণ তিন আঙ্গুলের বাঁধনে বাধাঁ কলমের কালি দিয়ে প্রকাশ করে যায় – জলছবিসম জীবনের কাব্যগাঁথা কে….! এরই মাঝে নিজেকে খুঁজে ফিরি প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর আগের হারানো সময়ের ভাসা ভাসা আবেগের স্মৃতির কুঞ্জবনে।

শহুরে চার দেয়ালের পারিবারিক কঠোরতায় আবদ্ধ জীবন আর চাকুরীজীবি পিতা-মাতার সন্তান রূপে বেড়ে ওঠায় – “দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া, ঘর হইতে দু’পা ফেলিয়া।” তবে বিদ্যালয়ের বার্ষিক পরীক্ষা শেষে মা-বাবার সাথে স্বল্পকালীন অবকাশ
যাপনে যাওয়া হতো চির আপন বকুলতলা রোড এ। যাত্রার সময়সীমা ফেরীর কারনে বিলম্ব ( ১০-১৪ ঘন্টা) ঘটলেও কারো মুখে বিরক্তির ছায়াটুকুও দেখিনি।

 

বাসের জানালা ভেদ করে যতদূর চোখ যেত,অনুভব করতাম আমার চর্মচক্ষুতে
দৃশ্যমান সুজলা,সুফলা, শস্য, শ্যামলা অতি প্রিয় মাতৃভূমি – আমার সোনার বাংলাদেশ কে! মাঠের পরে মাঠ জুড়ে শর্ষে ফুলের হলুদ চাদর বিছানো বিস্তীর্ণ প্রান্তর, বাসন্তী রঙা গাঁদা ফুলের ঝোপের অপার সৌন্দর্য, বাতাসের দোলায় আন্দোলিত ধানের শীষে ফিঙে পাখির নাচন,পলাশের রাঙা রঙে রঙ্গিন বৃক্ষশোভা, জাল দিয়ে মাছ ধরার উদ্যমতা, তাল-নারকেল- সুপারি- খেজুর গাছের সারি ছোঁয়া মেঠো আল বেয়ে গ্রামীণ বধূর পথ চলার রেশ, স্বচ্ছ্ব আকাশে বকের পাতির অবাধে উড়ে চলা, দূরন্ত গতির যানগুলোর প্রকৃতির সবকিছুকে পিছনে ফেলে দ্রুত সামনে এগিয়ে যাবার প্রতিযোগিতা…………সবকিছুই আমাকে উচ্ছ্বসিত করতো!

 

প্রকৃতিকে সর্বান্তকরণে ছুঁয়ে ছুঁয়ে অবশেষে পৌঁছতাম, কাঙ্ক্ষিত ঠিকানাতে। আমরা বলতাম – ” দিদা’র বাড়ি “। মনে অনেক উচ্ছ্বাস, আদুরে অনুভূতি নিয়ে কাঠের গুঁড়িতে কুমির খোদাই করা সেই স্মৃতিমাখা মূল ফটকের সামনে পৌঁছতাম। দিদা’র আত্নিক অভ্যর্থনায় আমরা আপ্লুত হতাম। দাদু লোক দিয়ে নারকেল গাছ থেকে ডাব পেড়ে আমাদের ডাবের জল খাইয়ে ভ্রমণজনিত তৃষ্ণা মেটাতেন। এরপরে শুরু হতো দিদা’র আদর মাখা উষ্ণ আতিথেয়তা।

অন্তঃপুরবাসিনী আমি ততক্ষণে অস্হির, কখন চৌহদ্দি ঘুরে বেড়াবো! ওখানকার সবকিছুতেই আমার মধ্যে অপার বিস্ময়কর ভালোলাগা মিশে থাকতো। আমরা পৌঁছেছি শুনলেই পাড়ার পরিজনরা দেখা করতে আসতো। বাড়ির উঠোনের নিজস্ব প্রান্তে শ্রী শ্রী গোপাল জিউ মন্দির ছিল – সত্য নারায়ণ ব্রত,ঝুলন,দোলযাত্রা, অন্নকূটসহ আবহমানকালের অনেক শুভ উৎসবের সাক্ষী। তারই প্রশস্ত বেদীতে বসে বিষাক্ত লাল পিঁপড়ার (ডাইয়া/লাউয়া) কামড় উপেক্ষা করে দাদুদের গাছের আম, বড়ই, আতা, জাম্বুরা, কাঁঠাল, নারকেলের কুচা খেতাম সেই সুবর্ণ শৈশবে। পূজার ফুল- দূর্বা- তুলসী সংগ্রহ করে, টিউবওয়েল চেপে পানি তুলে, ঘর- উঠোন পরিষ্কার করে দিদা’র কাজ এগিয়ে দিতাম। সত্য নারায়ণ ব্রত আয়োজনে আগত ভক্তদের ললাটে চন্দনটিকা পড়ানো, ব্রতশেষে পূজোর প্রসাদ মামার সাথে বাড়ি বাড়ি যেয়ে বিতরণ করা খুব উপভোগ করতাম। দাদার তিন চাকার রিকশাটাকে (সাইকেল গাড়ি) ঘিরে পাড়াতো ভাই-বোনদের সে কি উল্লাস চলতো উঠোন জুড়ে! দিদা’র সুপারি গাছের শুকনো খোলে বা নারকেল গাছের শুকনো পাতায়(ডাউগ্গা) বসে টানাটানির খেলায় আমিও মেতেছি কিয়ৎকালের জন্য হলেও। মূল ভিটার বিপরীত দিকের লাকড়িঘর, হেঁসেল, ঘাটলা দেয়া পুষ্করিণী, শুকিয়ে যাওয়া পাতকুয়ো, কলাগাছের ঝোঁপ, সন্ধ্যামালতী- বেলী-টগর-ঝুমকোজবা- স্হলপদ্ম-অপরাজিতা-মরিচা ফুলের ঘন ঝাড় যেন আজও চোখে ভাসে।

 

পালপাড়ার মাটির তৈজসপত্র, হোমিও- প্যাথির নবীন ফার্মেসী, সাধনা ঔষধালয়, বড় মসজিদ, চান্দা পুষ্করিণী, রেল অফিসের দীঘি,স্বান্তনা সিনেমা হল,আঁখড়ার ছোট্ট সেতু,সুদীর্ঘ বালুর মাঠে স্তূপীকৃত বড় বড় মটকা,অলকা-কনিকা-স্বপ্না মাসিদের বাড়ির বকফুল, রেইনট্রি আর রয়েল গাছের চিরল চিরল পাতার ঝিরিঝিরি ছন্দে ঝরে পড়া চত্বর আমার স্মৃতির মোহময়তায় যেন প্রিয় অঙ্গনরূপে জড়িয়ে আছে! দাদুর চোখ রাঙানো আমলে না নিয়ে, দুপুরের ভাতঘুম বাদ দিয়ে আমি আর শিউলি সিঁড়িতে বসে কত গল্পে মেতেছি! শিপ্রা, নূপুর, বিপুল, কণা,নিপা,লতা….তোদের খুব মিস্ করি রে!আমাদের জীবন যে এখন যান্ত্রিকতায় সেই সারল্য হারিয়েছে। এখানে শুধুই টিকে থাকার লড়াই। চারপাশের নেতিবাচকতা আর ঠুনকো প্রতিযোগিতা দেখে ভয়,বিস্ময়ে কুঁকড়ে যাই, হাঁপিয়ে উঠি।

মায়ের কাছে শুনেছি, আমাদের বড় মামা গৌর শিশুবয়সে আনুমানিক প্রায় ৬৫ বছর আগে পুষ্করিণীটাতে পড়ে ডুবে মারা গিয়েছিল। শৈশবে ঐ পুকুরের অস্বচ্ছ্ব জলে মাছের খেলা দেখতাম। পুকুরটায় আমি কয়েকবার বড়সড় সাপও দেখেছি। শিউলি না থাকলে একাকী ভরদুপুরে অত বিশালতায় আমার গা ছমছম করতো। উঠোনে বের হতাম না। রয়েল হোটেলের সোরগোল আর নাগরিক প্রয়োজনে সেই পুকুরটাও একসময় ভরাট হয়ে গেল। সন্ধ্যে না হতেই ঘুটঘুটে অন্ধকারে হারিয়ে যেত আমার সব উচ্ছ্বাস! দাদু প্রতি ঘরে লন্ঠন /হারিকেন জ্বালিয়ে দিত। ঠাকুর ঘরে দিদার পাশে বসে আরতি দেখতাম। শঙ্খনাদ আর কাশর-ঘন্টার তালে বৃন্দাজীতে (তুলসীতলায়) প্রদীপ প্রজ্বলিত করে সন্ধ্যার আবাহন শেষে, হেঁশেলে বসে মা- দিদা- মাসিদের আবেশমাখা কত আলাপনই না হত! তবে ঝিঁঝিঁ পোকার ক্রমাগত ঘ্যানঘ্যানে আওয়াজ আর ঘরের বাইরে গেলে অসংখ্য জোনাকির আলোর অদৃশ্য হয়ে যাওয়া ক্ষণ আমার মনে অন্তহীন ভীতি জাগাতো। দিদা বিভিন্ন সময়ে পাটিসাপটা, ভাপা পুলি, সন্দেশ, পায়েস, রসবড়া, দুধপুলি, আমসত্ত্ব, আমের আচার, বড়ই এর আচার তৈরি করতেন। দিদা’র হাতের রান্নার সুস্বাদ আজও আমার রসনাবোধে মিশে আছে।এমন মাঘের কনকনে শীতের সকালে অবাক বিস্ময়ে আমি পুঁই, শীমের লতা বেয়ে শিশিরের টুপটাপ ঝরে পড়া দেখতাম! হা করলে মুখ থেকে হিম হাওয়া বের হতো। এতো ঠান্ডা লাগতো যে, রাতে লেপ গায়ে দিলে জলে ভেজা কাপড়ের মতো স্পর্শ অনুভূত হতো। শীতের কাঁপুনিতে দাঁতে দাঁতে ঘর্ষণে শব্দ হতো। নারকেল তেল জমাট বেধে ঘন,শক্ত হয়ে যেতো। দিদা রাতে মাটির পাত্রে কাঠ-কয়লা পুঁড়িয়ে সেই তাপে উষ্ণতা নিত(আগুন পোহাতো)! আমাদের শহুরে সন্তানদের অভিজ্ঞতায় এই হৃদয়গ্রাহী ছোঁয়াগুলো একটু হলেও অনুপস্থিত। ওরা ডিজিটাল স্মার্ট স্ক্রিনে অনুভূতিকে বাটন চেপে খোঁজে……!

কালক্রমে, সেই বাড়ির কন্যাগণ অন্য ঠিকানায় স্থানান্তরিত হলো। নববধূ অপরূপা মামির স্নেহ – সান্নিধ্যটুকুও আমার স্মৃতির ডালিতে সঞ্চিত রয়েছে। সব কাজিনদের ভীষন মিস্ করি। এসবের সাথেই বাবার পৈতৃক ভিটা, উঠোন, পুকুরপাড়, গাছগাছালি, দিগন্তজোড়া সবুজ-সোনালী ফসলের ক্ষেত, ঠাকুরদা-ঠাকুরমা’র সমাধি কুঞ্জ আজও মিশে আছে আমার স্মৃতিকাননে। আগন্তুকদের আগমনে অস্পষ্ট ঠিকানা না হয় ইতিহাস হয়েই থাক্। কয়েকটি মৃত্যুর বেদনগাথা সব সম্পর্কেরই রূপান্তর ঘটালো।বদলে যাওয়া সর্বত্রই তালাবদ্ধ অবরুদ্ধ দ্বার। শুধু আমার স্মৃতির মানসপটেই অসীম, অতল উন্মুক্ততা। এখানে তালা নেই, তাই চাবিও লাগেনা। রাত জাগা ক্লান্তিতে, একাকী নিভৃতে বিচরন করলেই ঘটমান ছেঁড়াকাব্য আত্মপ্রকাশ করে একান্ত সঙ্গীরূপে। কপোল বেয়ে গড়িয়ে পড়া অশ্রুধারা হৃদপিণ্ডের কাছাকাছি পৌঁছে বলে, স্মৃতি হয়ে আমরা আছি তোমারই সাথে। হারাবো না কখনও , হারিয়ে যেতে দিও না কোনদিন। জিইয়ে রাখা টলমলে প্রদীপ শিখাসম স্মৃতিসুধা আমায় তাড়িয়ে বেড়ায় প্রতিনিয়ত। আমি দিশা খুঁজে বেড়াই স্মৃতির সেই নিকুঞ্জ পথে………..!

লেখকঃ কবি ও প্রাবন্ধিক।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




themesba-zoom1715152249
© কুমিল্লা দর্পণ। সর্বসত্ব সংরক্ষিত
ডিজাইন ও ডেভেলপে Host R Web